নুহাশ পল্লী

ধরন: উদ্যান
সহযোগিতায়: Nayeem
Facebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedinmail

বিস্তারিত


article


গাজীপুরের পিরুজালী গ্রামের বেশীরভাগ পথই ঘন শালবনে আচ্ছাদিত। আলো আধারিতে ঢেকে থাকা এমনই একটি পথ আপনাকে নিয়ে যাবে গাজীপুর সদর থেকে ২৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত নুহাশপল্লীতে। কথার জাদুকর হুমায়ুন আহমেদের জন্য নুহাশপল্লী ছিল একটি স্বর্গ। টিভি নাটক এবং চলচ্চিত্র নির্মাণ শুরু করার পর তিনি তাঁর বেশীরভাগ সময় এখানেই কাটিয়েছেন। সকলের জন্য উন্মুক্ত নুহাশপল্লীতে আসলে ছবিরমত সুন্দর এই জায়গাটি ঘুরে দেখতে পারবেন।

১৯৯৭ সালে ২২ বিঘা জমির উপর স্থাপিত নুহাশপল্লীর বর্তমান আয়তন প্রায় ৪০ বিঘা। অভিনেতা ডাঃ ইজাজ এখানকার জমিটি কিনতে সহায়তা করেন। হুমায়ুন আহমেদ এবং তাঁর প্রথম স্ত্রী গুলতেকিন আহমেদের একমাত্র পুত্র নুহাশের নামে নুহাশপল্লীর নামকরণ করা হয়েছে। গান এবং প্রকৃতির সান্নিধ্যে থাকতে ভালবাসতেন হুমায়ুন আহমেদ।জীবদ্দশায় সর্বশেষ নুহাশ পল্লীতে আসার পর তিনি নুহাশ পল্লীতে হেঁটে বেড়িয়েছিলেন এবং একান্ত কিছু মুহূর্ত প্রকৃতির কাছে থেকে অতিবাহিত করেছিলেন।নুহাশ পল্লীর উত্তর প্রান্তে একটি বড় পুকর রয়েছে যেটির উপর একটি কাঠের সেতু নির্মাণ করা হয়েছে। পুকুরের মাঝে কৃত্রিম দ্বীপ তৈরি করে একটি তাঁবু টানানো হত। হুমায়ুন আহমেদ ও তাঁর স্ত্রী মেহের আফরোজ শাওনের একটি কন্যা সন্তান পৃথিবীর আলো দেখার আগেই মারা যায়। হুমায়ুন আহমেদ তাঁর সেই কন্যার নাম দিয়েছিলেন লীলাবতি। এই পুকুরটির নামও রাখা হয়েছে লীলাবতি। হুমায়ুন আহমেদ লীলাবতি নামে একটি গ্রন্থও রচনা করেছেন।

হুমায়ুন আহমেদ যুক্তরাষ্ট্রে চিকিৎসাধীন থাকার সময় এই পুকুরের পাশেই ‘ভুতবিলাস’ নামে একটি ভবন নির্মাণ করা হয়। জীবদ্দশায় সর্বশেষ নুহাশ পল্লীতে আসার পর হুমায়ুন আহমেদ ভুত বিলাসের উদ্বোধন করেছিলেন। তিনি মনে করতেন মধ্যরাতে ভুতবিলাসের বারান্দায় বসে থাকলে ভুতের দেখা পাওয়া যাবে।

স্থানীয় স্থপতি আসাদুজ্জামান খানের তৈরি করা বেশকিছু ভাস্কর্য রয়েছে নুহাশ পল্লীতে। এখানে প্রবেশের সময় ‘মা ও শিশু’ নামক ভাস্কর্যটি দেখে মুগ্ধ না হয়ে পারবেন না। শিশুদের আনন্দ দিতে এখানে ভুত এবং ব্যাঙের আকারের ভাস্কর্য নির্মাণ করা হয়েছে। এছাড়া এখানকার ট্রি হাউজটি শিশুদের আনন্দের অন্যতম উৎস। হুমায়ুন আহমেদ ভালবাসতেন বৃষ্টি এবং পূর্ণিমার রাত। বৃষ্টি দেখার জন্য তিনি ‘বৃষ্টি বিলাস’ নামে একটি কক্ষ নির্মাণ করেছিলেন। হুমায়ুন আহমেদ যেন চাঁদের ছায়া দেখতে পারেন এজন্য এখানকার সবুজ উঠান সর্বদা পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখা হত। নুহাশ পল্লীর ম্যানেজার বুলবুল নয়জনের একটি দল নিয়ে এখানকার সবকিছু দেখাশোনা করেন।

হুমায়ুন আহমেদ যখনই দেশে ও বিদেশে ভ্রমন করতেন তিনি বিভিন্ন রকমের গাছ সংগ্রহ করতেন। নুহাশ পল্লীতে প্রায় ৩০০ প্রজাতির ফলের এবং ঔষধি গাছ রয়েছে। এছাড়া তিনি এখানে খেজুর গাছ এবং চা গাছ লাগিয়েছিলেন যা এখনও আছে।প্রথমদিকে হুমায়ুন আহমেদ নুহাশ পল্লীতে মেহমান নিয়ে আসতেন যারা নুহাশ পল্লী ঘুরে দেখত। তিনি অতিথিদের বিভিন্ন গাছের সাথে পরিচয় করিয়ে দিতেন এবং একটি বিশেষ সুগন্ধিযুক্ত গাছের পাতার স্বাদ গ্রহনের আমন্ত্রন জানাতেন।

বরেণ্য এই লেখকের শোবার ঘরের কাছেই রয়েছে একটি সুইমিংপুল। মাঝে মাঝে প্রিয়জনদের নিয়ে তিনি এখানে সাঁতার কাটতেন। একবার হুমায়ুন আহমেদ ভারতের প্রখ্যাত লেখক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় কে নিয়েও সাঁতার কেটেছিলেন। হুমায়ুন আহমেদের পরিচালিত বেশীরভাগ সফল নাটক ও সিনেমার শুটিং করা হয়েছিল এই নুহাশ পল্লীতেই।


sml ad 2


কিভাবে যাবেন

গাজীপুর জেলার মির্জাপুর ইউনিয়নের পিরুজালি গ্রামে নুহাশপল্লী অবস্থিত। ঢাকা থেকে বাসে করে গাজীপুরের হোতাপাড়া বাসস্ট্যান্ডে পৌছাতে পারবেন। ঢাকা থেকে শ্রীপুর, মাওনা, কাপাসিয়া এবং হোতাপুরের উদ্দেশ্যে প্রভাতি, বনশ্রীসহ বেশকিছু বাসচলাচল করে। বাসে যেতে খরচ হবে ৫০/- টাকা থেকে ৭০/- টাকা।

হোতাপাড়া বাসস্ট্যান্ড থেকে ৮ কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত নুহাশপল্লীতে টেম্পো, রিকশাভ্যান, অথবা বেবিট্যাক্সিতে পৌছাতে পারবেন। টেম্পোতে উঠলে ভাড়া দিতে হবে ৩০/- টাকা। এছাড়া রিকশা এবং ট্যাক্সিতে খরচ হবে যথাক্রমে ৫০/- টাকা থেকে ৬০/- টাকা এবং ১০০/- টাকা থেকে ১২০/- টাকা। ঢাকা থেকে গাড়ি ভাড়া করে অথবা ব্যাক্তিগত গাড়িতে সরাসরি নুহাশপল্লীতে যেতে পারবেন।

কিভাবে পৌঁছাবেন: গাজীপুর জেলা

ঢাকা থেকে গাজীপুরে দিনের ২৪ ঘণ্টাই বিভিন্ন বাস চলাচল করে। যেমনঃ ঢাকার আজিমপুর থেকে টঙ্গীর হোসাইন মার্কেটে অনিক এবং উইনার বাস সার্ভিস চলাচল করে। এছাড়া সিএনজি অটোরিকশা অথবা ব্যাক্তিগত গাড়িতেও গাজীপুরে পৌছাতে পারেন।

ঢাকা-টঙ্গী ডাইভারশন সড়ক এবং টঙ্গী-কালীগঞ্জ ডাইভারশন সড়কের মাধ্যমে ঢাকার সাথে গাজীপুরের সড়ক যোগাযোগ স্থাপিত হয়েছে। রেলপথেও গাজীপুরে যাওয়া যায়। গাজীপুরের ৭টি রেলস্টেশন হলঃ রাজেন্দ্রপুর, শ্রীপুর, ধীরাশ্রম, জয়দেবপুর, টঙ্গী, সাতখাঁমাইর এবং পুবাইল।
ঢাকা থেকে গাজীপুরে বিভিন্ন বাস সার্ভিস রয়েছে। যেমনঃ পুবালি পরিবহন মহাখালি থেকে নরসিংদীতে চলাচল করে। এছাড়া কেটিএল সার্ভিস ঢাকা থেকে কালীগঞ্জে চলাচল করে। ঢাকা থেকে গাজীপুরে চলাচলকারী বিভিন্ন রুটের বাস সার্ভিসগুলোর মধ্যে আছেঃ
আজমেরি পরিবহনঃ নন্দন পার্ক- সদরঘাট
প্রভাতি-বনশ্রীঃ
১। গুলিস্তান- কালিয়াকৈর
২। গুলিস্তান –কাপাসিয়া
৩। গুলিস্তান -শ্রীপুর
৪। গুলিস্তান –ত্রিমোহনী
সালসাবিল— যাত্রাবাড়ি –কোনাবাড়ি
রাহবার—লোহারপুল-মৌচাক
আনাবিল-যাত্রাবাড়ি
ট্রান্সসিলভা- যাত্রাবাড়ি-গাজীপুর
গাজীপুর পরিবহন লিমিটেড-ধাকা-গাজীপুর
ঢাকা পরিবহন লিমিটেড-মতিঝিল-গাজীপুর
ভিআইপি ২৭-গাজীপুর চৌরাস্তা-আজিমপুর
বলাকা পরিবহন-শিববাড়ি বাজার-সদরঘাট

ঢাকার কমলাপুর রেলস্টেশন থেকে গাজীপুরে ট্রেন চলাচল করে। গাজীপুর জেলায় ৭ টি রেল স্টেশন রয়েছে।

কোথায় থাকবেন

গাজীপুরে থাকার ব্যবস্থা বেশ উন্নত। এখানে বিভিন্ন মানের হোটেল রয়েছে থাকার জন্য। এখানকার হোটেলগুলোর মধ্যে উল্ল্যেখযোগ্য হলঃ

হ্যাপি ডে ইন
মোবাইলঃ ০১১৯১০০৪৮০১-৪

নক্ষত্রবাড়ি রিসোর্ট
ফোনঃ ৫৭৫২৫৭৩

পুষ্পদম রিসোর্ট
মোবাইলঃ ০১৭৫০০২৭৭৭

রাঙ্গামাটি ওয়াটারফ্রন্ট
মোবাইলঃ ০১৭১২৮১৭৭৭০, ০১৮১১৪১৪০৭৪

কি করবেন

নুহাশপল্লীতে ঘুরে দেখার জন্য অনেক কিছুই রয়েছে যেমনঃ
১। গ্রামের বিশাল সবুজ মাঠ।
২। প্রায় ২৫০ প্রজাতির গাছ।
৩। হুমায়ুন আহমেদের কটেজ, ট্রিহাউজ, দাবা খেলার এবং নামাজপড়ার কক্ষ।
৪। ডিম্বাকৃতির সুইমিংপুল।
৫। টিনশেডের বিশাল বারান্দাসহ ‘বৃষ্টিবিলাস’ কটেজ ও ভুতবিলাস কটেজ।
৬। কাদামাটি ও টিন দিয়ে তৈরি করা শুটিং স্টুডিও।
৭। ঔষধি গাছের বাগান।
৮। মৎস্যকন্যার মূর্তিসহ একটি পানির রিজার্ভার। এটির পাশে একটি রাক্ষসের মূর্তিও আছে।
৯। কনক্রিট দিয়ে তৈরি ডাইনোসারের মূর্তি।
১০ প্রাচীন আদলে নির্মিত কিন্তু আধুনিক ঘাট সমৃদ্ধ দিঘাল দীঘি।
১১। লেকের মাঝে বসার জন্য একটি ছোট দ্বীপ রয়েছে।
১২। এছাড়াও রয়েছে শালবন, অর্কিড বাগান সহ এখানকার তিনটি বাংলো।

খাবার সুবিধা

নুহাশ পল্লীর অভ্যন্তরে খাওয়ার ব্যবস্থা নেই। আপনার দল যদি ১০ জনের নিচে হয় তবে খাবার ব্যবস্থা নিজ দায়িত্বে করতে হবে; আর ১০ জনের উপর হলে, নুহাশ পল্লীর সাথে আগে থেকে যোগাযোগ করলে উনারা ব্যবস্থা করে দিবেন।

ভ্রমণ টিপস

নুহাশ পল্লীতে মাত্র একদিনের জন্য পিকনিক করার ব্যবস্থা রয়েছে। এজন্য কটেজের ৪ টি কক্ষ বরাদ্দ করা আছে। পিকনিকের জন্য একটি দলে সর্বচ্চ ৩০০ জন থাকতে পারবে।

বুকিং এর জন্য যোগাযোগ করতে পারেনঃ
ফোনঃ ০১৯১১ ৯২০ ৬৬৬, ০১৭১১৯৪৭৯৩১, ০১৭১২০৬০৯৭১

পিকনিক এর জন্য বিস্তারিত এই ওয়েব সাইটে পাবেন – http://www.vromonbilash.com

আপনি নুহাশ পল্লীতে সূর্যাস্তের পর অবস্থান করতে পারবেন না। এপ্রিল থেকে নভেম্বর দর্শনার্থীদের জন্য নুহাশ পল্লী উন্মুক্ত থাকে। ১০ বছরের বেশি প্রত্যেককে ২০০/- টাকা প্রবেশ মূল্য দিতে হবে।

মানচিত্র

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কথা বলুন

এই মুহূর্তে অনলাইনে না থাকায় আমরা দুঃখিত! কিন্তু আপনি আমাদের ই-মেইল পাঠাতে পারেন। আমরা ২৪ ঘন্টার মধ্যে আপনার প্রশ্নের উত্তর দেব।

আপনার প্রশ্ন বা সমস্যার সহযোগিতা করায় আমরা সর্বদা তৎপর!

ENTER ক্লিক করুন