নাজিমগড় ন্যাচারাল পার্ক সিলেটের লালাখালে সারি নদীর তীরে অবস্থিত। ভারতের মেঘালয় রাজ্যে সীমান্তবর্তী জৈন্তা পাহাড়ের পাদদেশে ছবির মত সুন্দর লালাখালের সারি নদীর তীরে নাজিমগড়ের ‘ন্যাচার পার্কটি’ অবস্থিত। সারি নদীর উৎপত্তি হয়েছে মেঘালয় রাজ্যের পশ্চিম জৈন্তা হিল ডিসট্রিক্টের জোয়াই শহরের কাছে অবস্থিত মিতিমইন্দু নামক স্থানে প্রায় ১৪২০ মিটার (৪৬৫০ ফুট) উঁচু থেকে। এখানে এই নদীটি খাসিদের ভাষায় মিন্দু অথবা “কা তাউইরকা তাকাম” (যার অর্থ আমাদের দেবদূত অভিভাবক) নামে পরিচিত। জোয়াই শহরকে তিনদিক থেকে ঘিরে থাকা মিন্দু নদীটি বাংলাদেশের লালাখালে সারি নদী হিসেবে প্রবেশের পূর্বে লেসকা ভ্যালীর মধ্যে দিয়ে দক্ষিন দিকে প্রবাহিত হয়ে জৈন্তা পাহাড়ের মধ্য দিয়ে বোরঘাট গ্রামে পৌঁছেছে।
পাহাড় থেকে সারি নদীর সাথে প্রচুর বালু এবং অন্যান্য খনিজ সম্পদ বয়ে আসার কারনে এই নদীর পানি নীল ও সবুজ রঙের সমন্বয়ে এক অপূর্ব বর্ণ ধারন করেছে। শুকনো মৌসুমে এই নদীটি শান্ত থাকে এবং এটির স্বচ্ছ পানি সবুজ রঙ ধারন করে। অথচ আবার বর্ষাকালে এই নদীটি এতটাই অশান্ত হয়ে ওঠে যে কখনো কখনো নদীর তীর প্লাবিত হয়ে যায়। আনুমানিক ১৩৪০ সালে বিশ্বের অন্যতম নামকরা পর্যটক মরক্কোর ইবনে বতুতা সিলেটে হযরত শাহজালাল (রঃ) এর সাথে সাক্ষাৎ করে ফেরার পথে এই ‘নীল’ নদীটি অতিক্রম করেছিলেন।
এই উদ্যানের অন্যতম আকর্ষণ হল ‘রিভার কুইন’ রেস্টুরেন্ট যেখান থেকে নদীর বাঁকের চমৎকার মনোরম দৃশ্য উপভোগ করা যায়। এই রেস্টুরেন্টের কাছে গাছের ছায়ায় রয়েছে ‘অ্যাডভেঞ্চার ক্যাম্পের’ তাঁবু। আরামদায়ক এসব তাঁবুতে অতিথিরা একদিকে প্রকৃতির কাছাকাছি আসতে পারবেন আবার পাশাপাশি অ্যাডভেঞ্চারও করতে পারবেন। এখানকার রাতের পরিষ্কার আকাশে আপনি তারাদের দেখতে পারবেন যা এখানে এসে নিজ চোখে না দেখলে বিশ্বাস করতে পারবেন না। এক কথায় বলা যায় যে প্রকৃতি তার বিশুদ্ধতম রুপে এখানে আবির্ভূত হয়েছে।
সূত্র: www.nazimgarh.com
সিলেট থেকে ৪৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত লালাখালে আসতে হলে আপনাকে বাসে অথবা গাড়িতে করে সিলেট তামাবিল সড়ক ধরে সারি ঘাটে পৌছাতে হবে। তারপর সারি ঘাট থেকে নৌকায় করে ২০ মিনিট থেকে ৪০ মিনিটের মধ্যে আপনি লালাখালে পৌঁছে যাবেন। ফেরার সময়ও আপনাকে একইভাবে একই পথ দিয়ে ফিরতে হবে।
ঢাকা থেকে সিলেটে আপনি সড়কপথে, রেলপথে এবং আকাশপথে পৌছাতে পারেন।
ঢাকা থেকে সিলেটের মধ্যে চলাচলকারি বাসগুলোর মধ্যে আছেঃ
১। গ্রীনলাইন পরিবহনঃ
ঢাকা থেকে ছেড়ে যায়ঃ সকাল ৮:৩০ মিনিটে, সকাল ১০ টায়, বিকাল ৪:১৫ মিনিটে, বিকাল ৫:৩০ মিনিটে এবং রাত ১২:৩০ মিনিটে; ভাড়াঃ ৮৫০/- টাকা (ভলভো), ১১০০/- টাকা (স্কেনিয়া);
২। শ্যামলী পরিবহনঃ
আরামবাগ কাউণ্টার, ঢাকা, ফোনঃ ৭১০২২৯১, ০১৯৩৬২৬০২৩;
সায়েদাবাদ কাউণ্টার, ঢাকা, ফোনঃ ০১৭১৮০৭৫৫৪১, ৭৫১১০১৯, ৭৫৫০০৭১;
৩। হানিফ পরিবহনঃ
পান্থপথকাউণ্টার, ঢাকা, ফোনঃ০১৭৩৪০২৬৭০
আরামবাগ কাউণ্টার, ঢাকা, ফোনঃ ০১৭১৩৪০২৬৭১
সায়েদাবাদ কাউণ্টার, ঢাকা, ফোনঃ ০১৭১৩৪০২৬৭৩
৪। টি আর ট্র্যাভেলস
৫। সোহাগ পরিবহন
উপরে উল্ল্যেখিত বাসগুলো প্রতিদিন ভোর ৬:৩০ মিনিট থেকে রাত ১১:৩০ মিনিট পর্যন্ত ঢাকার মালিবাগ রেলগেট, রাজারবাগ এবং সায়েদাবাদ বাসস্ট্যান্ড থেকে সিলেটের পথে ছেড়ে যায়। নন এসি এসব বাসের ভাড়া প্রায় ৫০০/- টাকা এবং এসি বাসের ভাড়া প্রায় ৮০০/- টাকা থেকে ১০০০/- টাকা।
ঢাকা থেকে সিলেটে বাংলাদেশ বিমান, নভো এয়ার, ইউনাইটেড এয়ারওয়েজ এবং রিজেণ্ট এয়ারওয়েজ দ্বিমুখী ফ্লাইট পরিচালনা করে থাকে। এসব বিমান সংস্থার একমুখি পথের ভাড়া পড়বে ৩০০০/- টাকা থেকে ৮০০০/- টাকা পর্যন্ত। প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত প্রায় ১০টির অধিক ফ্লাইট ঢাকা থেকে সিলেটে আসা যাওয়া করে।
ঢাকা থেকে সিলেটের উদ্দেশ্যে জয়ন্তিকা এক্সপ্রেস, পারাবত এক্সপ্রেস এবং উপবন এক্সপ্রেস যথাক্রমে সকাল, দুপুর ও সন্ধ্যায় ছেড়ে যায়। এছাড়া বিকালবেলা নয়া সংযোজিত কালিনী এক্সপ্রেস সিলেটের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়। রেলপথে সিলেটে পৌছাতে ৭ ঘণ্টা থেকে ৮ ঘণ্টা সময় লাগবে। এসব ট্রেনের ভাড়া পরবে শোভন শ্রেণীর আসনের জন্য ২৯৫/- টাকা এবং তাপানুকুল প্রথম শ্রেণীর আসনের জন্য ৬৭৯/- টাকা।
ট্রেনের যাত্রার সময়সূচী:
১।কালিনী এক্সপ্রেসঃ ঢাকা থেকে ছেড়ে যায় বিকাল ৪ টায়; সিলেটে পৌঁছে রাত ১০:৩০ মিনিটে; বন্ধের দিনঃ শুক্রবার;
২। পারাবত এক্সপ্রেসঃ ঢাকা থেকে ছেড়ে যায় সকাল ৬:৪০ মিনিটে; সিলেটে পৌঁছে দুপুর ১:৩৫ মিনিটে; সিলেট থেকে ছেড়ে যায় দুপুর ৩ টায়; ঢাকায় পৌঁছে রাত ১০:৩০ মিনিটে; বন্ধের দিনঃ মঙ্গলবার;
৩। উপবন এক্সপ্রেসঃ ঢাকা থেকে ছেড়ে যায় রাত৯:৫০ মিনিটে; সিলেটে পৌঁছে ভোর ৫:৩০ মিনিটে; সিলেট থেকে ছেড়ে যায় রাত ১০ টায়; ঢাকায় পৌঁছে ভোর ৫:৩০ মিনিটে; সিলেটে বন্ধের দিন নেই তবে ঢাকায় বন্ধের দিনঃ বুধবার;
৪। জয়ন্তিকা এক্সপ্রেসঃ ঢাকা থেকে ছেড়ে যায় দুপুর ১২ টায়; সিলেটে পৌঁছে রাত ৭:৫০ মিনিটে; সিলেট থেকে ছেড়ে যায় সকাল ৮:২০ মিনিটে; ঢাকায় পৌঁছে বিকাল ৪ টায়; সিলেট ও ঢাকায় ট্রেনটির কোন বন্ধের দিন নেই;
শ্রেণীভেদে এই ট্রেনগুলোর ভাড়া ৭৫/- টাকা থেকে ১০১৮/- টাকা পর্যন্ত।
সিলেটে থাকার জন্য বেশকিছু ভালমানের হোটেল রয়েছে। এসব হোটেলের বেশীরভাগ মাজার রোড, আম্বরখানা, এবং জিন্দাবাজারে অবস্থিত। এসব হোটেলের মধ্যে উল্ল্যেখযোগ্য হলঃ
১। হোটেল ইস্টার্ন গেইট এন্ড পানাহার রেস্টুরেন্ট।
২। হোটেল গুলশান।
৩। হোটেল দরগা ভিউ।
৪। গ্রিনল্যান্ড হোটেল এন্ড রেস্টুরেন্ট।
৫। হোটেল সিটি লিঙ্ক ইন্টারন্যাশনাল।
৬। সুরমা ভ্যালী রেস্ট হাউজ।
৭। হোটেল বাহারাইন রেসিডেনসিয়াল।
৮। হোটেল কুরাইশি রেসিডেন্স।
৯। হোটেল আজমীর।
১০।হোটেল পায়রা।
১১।হোটেল সুপ্রিম।
১২।হোটেল পলাশ।
১৩।হোটেল ওয়েস্টার্ন।
১৪।হোটেল অনুরাগ।
১৫।হোটেল আল-আমীন।
১৬।হোটেল গার্ডেনস ইন।
১৭।হোটেল ফেরদৌস।
১৮।হোটেল পানামা।
১৯।হোটেল গ্রীন।
২০।হোটেল হিলটাউন।
২১।হোটেল রোজভিউ।
২২।হোটেল স্টার প্যাসিফিক।
২৩।হোটেল তাজমহল।
এখানে অনেক কিছু করার আছে যেমন সাঁতার কাটা, সারি নদীতে নৌকা ভ্রমন করা। পাহাড় ও বনকে ঘিরে তৈরি হাঁটার জায়গা ধরে দিনে অথবা রাতে আপনি হাঁটতে পারেন। সন্ধ্যাবেলা আপনি গানও গাইতে পারেন অথবা অ্যাডভেঞ্চারের জন্য ট্র্যাকিং করতে পারেন।
এই উদ্যান এবং আশেপাশের এলাকায় বিভিন্ন প্রজাতির পাখি বিচরণ করে থাকে। এসব পাখিদের দেখার পাশাপাশি সকাল ও সন্ধ্যায় পাখিদের কিচিরমিচির আওয়াজ শোনা একটি বিরল অভিজ্ঞতা বৈকি!
প্রকৃতির সৌন্দর্য এবং নীরবতার মধ্যে অবস্থিত এই স্থানটি পর্যটকদের সতেজ করবে এতে কোন সন্দেহ নেই। নতুন প্রজন্ম এখানে এসে নিঃসন্দেহে প্রকৃতির বিশুদ্ধতাকে নতুনভাবে আবিষ্কার করতে পারবে। এখানে আগত প্রত্যেককেই এই ন্যাচার পার্কটি যে নতুনভাবে প্রকৃতিকে চেনাবে সেটি নির্দ্বিধায় বলা যায়।
১। রিভার কুইনঃ ছবির মত সুন্দর সারি নদীর ওপর নির্মিত এই রেস্টুরেন্টটির অনন্যতা রয়েছে এটির নির্মাণশৈলীতে। এখানে বাংলাদেশি খাবারের পাশপাশি আপনি অনেক পদের কাবাবও খেতে পারবেন। এখানে নদীর তীরে পার্টির আয়োজন করা যায় আবার শীতকালে ক্যাম্প ফায়ার এবং বারবিকিউ এর আয়োজনের জন্য এই রেস্টুরেন্টটি একটি যথার্থ স্থান।
২। হরাইজন রেস্টুরেন্টঃ: নাজিমগড়ের সবুজ প্রান্তরে এটি একটি খোলামেলা রেস্টুরেন্ট যেখান থেকে আশেপাশের মনোরম দৃশ্য পরিষ্কারভাবে দেখা যায়। রিসোর্টের সকালের নাশতা এই রেস্টুরেন্টেই পরিবেশন করা হয়। এখানে কন্টিনেন্টাল, থাই, চাইনিজসহ নানা পদের খাবার পাওয়া যায়।
৩। মাউণ্টেইন ভিউ লাউঞ্জঃ পাহাড়ের ওপর নির্মিত এই রেস্টুরেন্ট থেকে মেঘালয়ের বিশাল পাহাড়গুলো দৃশ্যমান হয়। এখানেও আপনি অনেক পদের খাবার খেতে পারবেন। পাহাড় ছোঁয়া মেঘ দেখতে পাওয়া এখানে আগত অতিথিদের জন্য নিঃসন্দেহে একটি বিরল এবং মনে রাখার মতো অভিজ্ঞতা।
আপনার প্রশ্ন বা সমস্যার সহযোগিতা করায় আমরা সর্বদা তৎপর!