টাঙ্গুয়ার হাওর বা টাঙ্গুয়া হাওর, বাংলাদেশের বৃহত্তর সিলেটের সুনামগঞ্জ জেলায় অবস্থিত একটি হাওর। প্রায় ১০০ বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে বিস্তৃত এ হাওর বাংলাদেশর দ্বিতীয় বৃহত্তম মিঠা পানির জলাভূমি। স্থানীয় লোকজনের কাছে হাওরটি নয়কুড়ি কান্দার ছয়কুড়ি বিল নামেও পরিচিত। এটি বাংলাদেশের দ্বিতীয় রামসার স্থান, প্রথমটি সুন্দরবন।
টাঙ্গুয়া হাওড় নামে পরিচিত টাঙ্গুয়ার হাওড় এদেশের অন্যতম জলাভূমি যেটি আন্তর্জাতিকভাবেও বহুলভাবে সমাদৃত। প্রায় ৪৬টি গ্রামসহ গঠিত এই হাওড়ের আয়তন প্রায় ১০০ কিলোমিটার যার মধ্যে ২৮০২.৩৬ হেক্টর এলাকা হল জলাভূমি। প্রায় ৪০০০০ মানুষ এই হাওড়ের ওপর জীবিকা নির্বাহ করে। এখানকার প্রাকৃতিক সম্পদের মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহারের কারনে সৃষ্ট নাজুক অবস্থার দরুন বাংলাদেশ সরকার ১৯৯৯ সালে টাঙ্গুয়ারহাওড়কে পরিবেশগত গুরুত্বপূর্ণ এলাকা হিসেবে ঘোষণা করে। ২০০০ সালে এই হাওড়কে রামসার সাইট অর্থাৎ আন্তর্জাতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ স্থান হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এই ঘোষণার কারনে সরকার এই হাওড়ের প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষা করতে বাধ্য থাকবে এবং সরকার এই মর্মে ইতিমধ্যেই কিছু পদক্ষেপ গ্রহন করেছে।
মাছের অন্যতম উৎস হওয়ার কারনে এদেশের মাছ চাষের ক্ষেত্রে এই হাওড়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করে চলেছে। ১৯৯৯-২০০০ সালে এই হাওড় থেকে মাছ চাষ বাবদ সরকার প্রায় ৭,০৭৩,১৮৪ টাকা রাজস্ব আদায় করে। এই হাওড়ে প্রায় ১৪০ প্রজাতির অধিক মিঠা পানির মাছ পাওয়া যায় যেগুলোর মধ্যে আছেঃ আয়ের মাছ, গাং মাগুর মাছ, বাইম মাছ, তারা মাছ, গুতুম মাছ, গুলশা মাছ, ট্যাংরা মাছ, টিটনা মাছ, গড়িয়া মাছ, বেটি মাছ, কাকিয়া মাছ ইত্যাদি। প্রতি বছর শীত মৌসুমে প্রায় ২০০ প্রজাতির অতিথি পাখি এই হাওড়ে এসে থাকে। এই জলাভূমিতে বিভিন্ন প্রকার মিঠা পানির উদ্ভিদও জন্মে থাকে যেমনঃ হিজল গাছ, করছ গাছ, গুল্লি গাছ, বালুয়া গাছ, বন তুলশি গাছ, নলখাগড়া গাছ ইত্যাদি।
টাঙ্গুয়ার হাওর সুনামগঞ্জ জেলার ধর্মপাশা ও তাহিরপুর উপজেলার মেঘালয় পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত। মেঘালয় পাহাড় থেকে ৩০টিরও বেশি ঝরা (ঝরণা) এসে মিশেছে এই হাওরে। দুই উপজেলার ১৮টি মৌজায় ৫১টি হাওরের সমন্বয়ে ৯,৭২৭ হেক্টর এলাকা নিয়ে টাঙ্গুয়ার হাওর জেলার সবচেয়ে বড় জলাভূমি। পানিবহুল মূল হাওর ২৮ বর্গকিলোমিটার এবং বাকি অংশ গ্রামগঞ্জ ও কৃষিজমি। একসময় গাছ-মাছ-পাখি আর প্রাকৃতিক জীববৈচিত্র্যের আধার ছিল এই হাওর। ১৯৯৯ খ্রিস্টাব্দে টাঙ্গুয়ার হাওরকে ‘প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়, তখনই অবসান হয় দীর্ঘ ৬০ বছরের ইজারাদারির। ২০০০ খ্রিস্টাব্দে ২০ জানুয়ারি এই হাওরকে ‘রামসার স্থান’ (Ramsar site) হিসেবে ঘোষণা করা হয়। হাওর এলাকার মানুষের আর্থসামাজিক অবস্থার পরিবর্তন, সম্পদ সংরক্ষণ ও টেকসই ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বাংলাদেশ ও সুইজারল্যান্ড সরকারের মধ্যে ২০০১ খ্রিস্টাব্দে ১২ ফেব্রুয়ারি একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। ২০০৩ খ্রিস্টাব্দের ৯ নভেম্বর থেকে হাওরের নিয়ন্ত্রণ নেয় জেলা প্রশাসন।
শীত মৌসুমে পানি শুকিয়ে কমে গেলে এখানকার প্রায় ২৪টি বিলের পাড় (স্থানীয় ভাষায় কান্দা) জেগে উঠলে শুধু কান্দা’র ভিতরের অংশেই আদি বিল থাকে, আর শুকিয়ে যাওয়া অংশে স্থানীয় কৃষকেরা রবিশস্য ও বোরো ধানের আবাদ করেন। এসময় এলাকাটি গোচারণভূমি হিসেবেও ব্যবহৃত হয়। বর্ষায় থৈ থৈ পানিতে নিমগ্ন হাওরের জেগে থাকা উঁচু কান্দাগুলোতে আশ্রয় নেয় পরিযায়ী পাখিরা —রোদ পোহায়, জিরিয়ে নেয়। কান্দাগুলো এখন (২০১২) আর দেখা যায় না বলে স্থানীয় এনজিও ও সরকারি ব্যবস্থাপনায় সেখানে পুঁতে দেয়া হয়েছে বাঁশ বা কাঠের ছোট ছোট বিশ্রাম-দণ্ড।
এখানকার বেশ কিছু উদ্ভিদ বিলুপ্ত হওয়ার পথে রয়েছে যেমনঃ হিজল (ব্যারিংটোনিয়া একুটেংগুলা), ক্লেমাটিস ক্যডমিয়া, ক্রাটাভা নুরভালা, ইউরাইল ফেরক্স, নেলুম্ব নুসিফেরা, অট্টেলিয়া আলিস মইডস, অক্সিস্তেল্মা সেকামনভার, সেকামন, পঙ্গামিয়া পিনাটটা, রসা ক্লিনফাইলা, টাইফা ইত্যাদি।
টাঙ্গুয়ার হাওরের জীববৈচিত্র্যের মধ্যে অন্যতম হলো বিভিন্ন জাতের পাখি। স্থানীয় বাংলাদেশী জাতের পাখি ছাড়াও শীতকালে, সুদূর সাইবেরিয়া থেকে আগত পরিযায়ী পাখিরও আবাস এই হাওর। এ হাওরে প্রায় ৫১ প্রজাতির পাখি বিচরণ করে। পরিযায়ী পাখিদের মধ্যে বিরল প্রজাতির প্যালাসেস ঈগল, বড় আকারের গ্রে কিংস্টর্ক রয়েছে এই হাওড়ে। স্থানীয় জাতের মধ্যে শকুন, পানকৌড়ি, বেগুনি কালেম, ডাহুক, বালিহাঁস, গাঙচিল, বক, সারস, কাক, শঙ্খ চিল, পাতি কুট (এই হাওরের ২৮-২৯%) ইত্যাদি পাখির নিয়মিত বিচরণ এই হাওরে। এছাড়া আছে বিপন্ন প্রজাতির পরিযায়ী পাখি কুড়ুল (বাংলাদেশে এর নমুনাসংখ্যা ১০০টির মতো)। ২০১১’র পাখিশুমারীতে এই হাওরে চটাইন্নার বিল ও তার খাল, রোয়া বিল, লেচুয়ামারা বিল, রুপাবই বিল, হাতির গাতা বিল, বেরবেরিয়া বিল, বাইল্লার ডুবি, তেকুন্না ও আন্না বিলে প্রায় ৪৭ প্রজাতির জলচর পাখি বা ওয়াটারফাউলের মোট ২৮,৮৭৬টি পাখি গণনা করা হয়। এই শুমারিতে অন্যান্য পাখির পাশাপাশি নজরে আসে কুট, মরিচা ভুতিহাঁস, পিয়ংহাস; সাধারণ ভুতিহাঁস, পান্তামুখী বা শোভেলার, লালচে মাথা ভুতিহাঁস, লালশির, নীলশির, পাতিহাঁস, লেনজা, ডুবুরি, পানকৌড়ি ইত্যাদি পাখিও।
এছাড়াও ৬ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী, ৪ প্রজাতির সাপ, বিরল প্রজাতির উভচর, ৬ প্রজাতির কচ্ছপ, ৭ প্রজাতির গিরগিটিসহ নানাবিধ প্রাণীর বাস, এই হাওরের জীববৈচিত্র্যকে করেছে ভরপুর।
অধ্যাপক আলী রেজা খান-এর বর্ণনানুযায়ী এই হাওরে সব মিলিয়ে প্রায় ২৫০ প্রজাতির পাখি, ১৪০ প্রজাতির মাছ, ১২’র বেশি প্রজাতির ব্যাঙ, ১৫০-এর বেশি প্রজাতির সরিসৃপ এবং ১০০০-এরও বেশি প্রজাতির অমেরুদণ্ডী প্রাণীর আবাস রয়েছে। (প্রেক্ষিত: জানুয়ারি ২০১২)
টাঙ্গুয়ার হাওড় বাংলাদেশের সুনামগঞ্জ জেলার উত্তর পূর্ব অংশের ধর্মপাশা এবং তাহিরপুর উপজেলায় অবস্থিত। ধর্মপাশা উপজেলায় গিয়ে রিক্সা নিয়ে এই হাওড়ে যেতে পারেন।
আপনি সুনামগঞ্জে সরাসরি শুধুমাত্র সড়কপথে যেতে পারবেন কারন সুনামগঞ্জের সাথে রেলপথে, আকাশপথে এবং নদীপথে সরাসরি কোন যোগাযোগের ব্যবস্থা নেই।
ঢাকা থেকে সুনামগঞ্জে চলাচলকারি বাসগুলোর মধ্যে আছেঃ
১। হানিফ এণ্টারপ্রাইজ:
– আরামবাগ কাউণ্টার, ফোন নং: ০১৭১৩-৪০২৬৭১
– সায়েদাবাদ কাউণ্টার, ফোন নং: ০১৭১৩-৪০২৬৭৩
২। শ্যামলী পরিবহনঃ
– আরামবাগ কাউণ্টার ঢাকা, ফোন নং: ৭১০২২৯১, ০১৯৩৬২৬০২৩
– সায়েদাবাদ কাউণ্টার ঢাকা, ফোন নং: ০১৭১৮০৭৫৫৪১, ৭৫১১০১৯, ৭৫৫০০৭১
৩। মামুন এণ্টারপ্রাইজ:
– সকাল ৭:৩০ মিনিট থেকে রাত ১২:৩০ মিনিট পর্যন্ত প্রতি ঘণ্টায় বাস ছেড়ে যায়।
– সায়েদাবাদ কাউণ্টার -০১৭১৮৪৩৮৭৩২, জনপথ মোড়-০১৯১৭৭৭০৬১, ফকিরাপুল- ০১৯১২৮৭৪৬৭
এছাড়াও রেলপথে অথবা আকাশপথে আপনি প্রথমে সিলেটে পৌছাতে পারেন। সিলেট থেকে বাসে করে আপনি সুনামগঞ্জে প্রায় এক ঘণ্টায় পৌছাতে পারবেন।
সুনামগঞ্জে থাকার জন্য বেশকিছু হোটেল রয়েছে। এসব হোটেলের মধ্যে উল্ল্যেখযোগ্য হলঃ
১। হোটেল নুর, পূর্ব বাজার স্টেশন রোড;
২। হোটেল নুরানী, পুরাতন বাসস্ট্যান্ড, স্টেশন রোড;
৩। হোটেল প্যালেস, পুরাতন বাসস্ট্যান্ড, স্টেশন রোড;
৪। সুরমা ভ্যালী আবাসিক রিসোর্ট;
১। টাঙ্গুয়ার হাওড়ের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য নৌকা ভাড়া করে দেখতে পারেন। এখানকার পানি এতটাই স্বচ্ছ যে আপনি জলভুমির তলদেশও দেখতে পারবেন।
২। সাথে করে অবশ্যই ক্যামেরা নিয়ে যাবেন।
৩। এখানকার বিভিন্ন প্রজাতির পাখীদের কিচিরমিচির উপভোগ করতে পারেন।
আপনাকে বাজারের কাছে অবস্থিত স্থানীয় রেস্টুরেন্টে খেতে হবে। এসব রেস্টুরেন্টের বেশিরভাগই পথের পাশে অবস্থিত। টাঙ্গুয়ার হাওড়ের আসে পাশে ভাল মানের রেস্টুরেন্ট না থাকলেও আপনি সুনামগঞ্জ শহরে ভাল মানের রেস্টুরেন্ট ও খাওয়ার হোটেল পাবেন।
বর্ষাকাল টাঙ্গুয়ার হাওড়ে বেড়াতে যাওয়ার সবচেয়ে উৎকৃষ্ট সময়।
আপনার প্রশ্ন বা সমস্যার সহযোগিতা করায় আমরা সর্বদা তৎপর!